জীবন থেকে নেয়া
বাস্তবতা
সময় চলে তার আপন গতিতে৷ কারো জন্য থেমে থাকেনা৷ আর সময়ের সাথে বয়ে যায় মানুষের জীবন৷ মানুষের জীবনও কখনো এক জায়গায় স্থির হয়ে বিরতি দিয়ে দেয় না। হয়ত কিছু কিছু ঘটনা বা সাময়িক অবস্থার জন্য জনজীবন স্থবির হয়ে যায়৷ কিন্তু কালেভদ্রে তা এই যান্ত্রিক জীবন থেকে হারিয়ে যায়। আবার শুরু হয় নতুন ভাবে বেঁচে থাকার লড়াই। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে চলতে মানুষের জীবন সংগ্রামী হয়ে দৌড়াতে থাকে। পেছনে কি আছে তা দেখার ফুরসত বা কই আছে এ জীবনে। একটা সময় আসে যখন আর লড়াই করার শক্তিটুকু থাকেনা।সংগ্রামী আর যান্ত্রিক জনজীবন থেকেই যেন মুক্ত হতে চায়। কিন্তু তখন আর চাইলেও তা হয়ে উঠে না। একই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হয়।জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে সেই পুরনো সৃতিটুকুই আকড়ে ধরে বাঁচতে ইচ্ছে হয়।মানুষ বড্ড সৃতিকাতর মন নিয়ে থাকে বলে মনে হয়। সময়ের ক্ষনিক সৃতিটাও যে একেক সময় বড় আশা জাগিয়ে দেয় মনে!
হুম,পদ্মনীল।আমার আজকের গল্পের নারী চরিত্রটির নাম পদ্মনীল।এতসব যান্ত্রিক জীবনের জটিল কথাগুলো মনে করিয়ে দেয়ার কারণ হচ্ছে মানুষ এভাবেই তাদের জীবন পরিচালিত করে।পদ্মের জীবনেও এমন কিছু ঘটনা আছে যা উপেক্ষা করে পেছনে ফেলে তাকে সময়ের সাথে চলতে হচ্ছে।
পদ্ম তার বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। বাবা রিজভী আহমেদ আর মা রায়সা আহমেদ।রিজভী আহমেদ একজন বড় ব্যাবসায়ী।নিজে অনেক কষ্টে এই ব্যাবসা শুরু করেছেন এবং সফলতার সাথে এখনো সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন।ভবিষ্যতে এ ব্যাবসাটা আরো বড় করার ইচ্ছা আছে।যাক সেসব কথা,পদ্মের জন্মের সময় তার মায়ের অবস্থা খুব আশংকাজনক ছিল,খুব কাছ থেকে মৃত্যু দেখা হয়ে গেছিল,তাই তারা পদ্মকে নিয়ে যথেষ্ট খুশি ছিল দ্বিতীয়বার আর কোন বাচ্চা তারা নিতে চায়নি।যাইহোক,তাদের খুবই পছন্দের নাম পদ্মনীল৷ আগে পরে আর কিছুই নেই। বাবা চাইতেন তার মেয়ে কে যেন সবাই এক নামেই চেনে। তবে মা তাকে সবসময় নীল বলেই ডাকত।মায়ের নীল পছন্দ।পদ্মের যখন স্কুলে প্রথম যাওয়া শুরু হয় তখন তার মায়ের অসুখ টা ধরা পড়ে। ঠিক কি অসুখটা বাধিয়েছে কেউ জানল না। ডাক্তারের ট্রিটমেন্ট চলছিল তবু যেন দিন দিন মা আরো অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিল। সে সময় ব্যাবসার কাজে বাবা বাইরে থাকত তাই হয়ত তেমন গুরুত্ব দিয়ে মা ডাক্তার দেখাত না।ভাবত যে ও সেরে যাবে।কিন্তু ঠিক লাস্ট স্টেজ আসার পর ধরা পড়ে যে মায়ের ক্যান্সার হয়।আসলে যেভাবে ট্রিটমেন্ট হয়েছিল তখন এ ব্যাপারটা কেউ বুঝতে পারেনি।বুঝতে পারার পর আর সময় ছিল না।পদ্মের ৭বছর বয়সেই তার মা তাকে ছেড়ে চলে যায়! এমন একটা ধাক্কা সামলাতে খুব কস্টই হয়েছিল বলতে হয় কিন্তু বছর কয়েক হতেই যেন সব আগের মত হয়ে গেল। পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হতে হয়েছে পদ্ম কে।মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে টা করেন নি। পার্শ্ববর্তী চাপের মুখে যে পড়েন নি তা নয়৷ কিন্তু পদ্ম তার অনেক আরাধনার মেয়ে যে! তাই তিনি পদ্ম কে নিয়ে বাইরে চলে যান।
তারপর কেটে গেল প্রাই ১০ বছর। এ লেভেল টা শেষ করে পদ্ম তার বাবাকে নিয়ে ফিরে আসে নিজ মাতৃভূমিতে।তারপর পদ্ম ভর্তি হয় ভাল মানের একটি কলেজে। মায়ের অকাল মৃত্য পদ্ম কে দৃঢ়ভাবে নাড়া দিয়েছিল।পদ্ম সেদিনই ঠিক করেছিল যে সে বড় হয়ে ডাক্তার হবে। আর মানুষের পাশে থাকবে। অকালে যাতে সুচিকিৎসার অভাবে কারোকে প্রাণ দিতে না হয়।
পড়াশোনায় খুবি ভাল ছিল পদ্ম। তাই তেমন অসুবিধা হচ্ছিল না৷ বছর যেতে না যেতেই পদ্মের ফাইনাল ইয়ার চলে এল। ফাইনাল দিয়ে পদ্ম ভাল রেজাল্ট ও করল।
এমন সময় ঘটল পদ্মের জীবনের চরম দুর্যোগ টা!
ভাল রেজাল্টের খবর দেবে বাবাকে।আনন্দে উৎসাহিত হয়ে বাসায় আসছিল হঠাৎ দেখে বাড়ির সামনে এম্বুল্যান্স!
বুকটা ধড়ফড়িয়ে উঠল।এ আবার কি হতে চলল পদ্মের জীবনে। খুব জোরে পা চালাতে গিয়ে বেসামাল হয়ে পড়ে যাচ্ছিল পদ্ম... আবার এলোপাথাড়ি হাটতে লাগে। গেটে পা দিয়ে ঢুকতেই দেখে বড় মামু বাবাকে ধরে ধরে বাইরের দিকে আসছেন।পদ্মের মুখ টা কেমন কাচুমাচু হয়ে গেল তার বাবাকে দেখে। বাবার চোখ আধবোজা,হাত পা দেখে মনে হয় চলতে পারছেনা। পদ্ম তাড়াতাড়ি গিয়ে তার বাবাকে ধরল,বাবা বাবা ডাকছে কিন্তু কোন সাড়া নেই। অসহায় চোখে তাকাল মামার দিকে।মামা সান্ত্বনার চোখে ভরসা দিল কিচ্ছু হবেনা। তবু পদ্ম জানতে চায় কি হয়েছে? মামা বলল,একটা এট্যাক হয়েছে মনে হচ্ছে,ডক্টর বলেছে হস্পিটালাইজড করতে হবে তাই এম্বুল্যান্স এসেছে। মামা আরো বলে,"তুই বাসায় যা মামি আছেন,আমি এদিকটায় দেখছি,ঘাবড়ানোর কিছু হয়নি আমিতো আছি।"
পদ্মের পা যেন আর চলেনা।তার মাথাটা ঘুরছিল।সে বাবা বাবা বলেই অজ্ঞান হয়ে যায়, মামি আর রেনু আপা এসে ধরাধরি করে বাসায় নিয়ে গেল।
প্রায় ঘন্টাখানেক পর জ্ঞান আসে পদ্মের। চোখ মুখ যেন ফোলে ফেপে আছে,আবার ও বাবা বাবা করছিল...তক্ষুনি মামি এসে জড়িয়ে ধরে পদ্মকে আর বুঝায় যে, এমন কিছু হয়নি।মামা ফোন করেছিল একটু আগে বাবাকে ডাক্তার দেখছেন। রেনু আপা খাবার নিয়ে আসল তাড়াহুড়ো করে,পদ্মের চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে নিজের ওড়না টা দিয়ে মুখ মুছে দিয়ে খাইয়ে দিচ্ছিল পদ্ম বাধা দেয় যে সে খাবেনা, বাবার ভাল কোন খবর না আসলে সে খাবেনা।কিন্তু রেনু আপা অনেকটা জোর করে খাওয়ালো। সেই ছোট থেকে পদ্ম কে তিনি দেখছেন।পদ্মের মায়ের দূর সম্পর্কের আত্বীয়।পদ্মের জন্মের সময় এখানে এসেছিল।মাঝে পদ্মরা যখন বাইরে ছিল তখন রেনু আপা এ বাড়িটায় থাকত।দেখাশোনা করত।এখনো আছেন এ বাড়িতে।তাই পদ্মকে তিনি অনেকটা আদর যত্নে বড় করছেন বলতে হয়।পদ্মের কোন উপায় নেই রেনু আপাকে অমান্য করা।
যাই হোক,সন্ধেবেলায় ফোন আসে হস্পিটাল থেকে। পদ্ম কথা বলে তার বাবার সাথে। এক চিলতে হাসি যেন ফোটে উঠে তার ঠোঁটের কোণে। বাবা ভাল আছে। কিন্তু এবার আর পদ্ম বাবাকে ছাড়বেনা।হ্যা অনেকদিন ধরে দেখছিল বাবা অফিস নিয়ে খুব টেনশনে আছে,কেন তা জানেনা পদ্ম তবে এবার বাবাকে সে আর অফিস করতে দেবেনা। বাবার জন্য সে অফিসে ম্যানেজার রেখে দেবে কিন্তু বাবাকে আর এত স্ট্রেস নিয়ে থাকতে দেবেনা। এ ব্যাপারে বাবা বাড়ি ফিরে আসলে কথা বলবে ভেবে রাখল পদ্ম।
হসপিটালের বেডে ভাল লাগছেনা রিজভী সাহেবের।তাই তিনি ডক্টর এর পরামর্শ নিয়ে রাতের বেলা বাসায় ফিরে এলেন। পদ্ম কখনো তাকে ছেড়ে থাকেনি এই ভেবে চলে আসলেন।তাছাড়া আজকে পদ্মের জীবনের অনেক বড় একটা দিন।এমন একটা দিনে কিনা তাকে অসুস্থ হতে হলো৷ তাই বাড়ি ফিরার সময় মেয়ের জন্য কিছু গিফট নিলেন আর মিষ্টিতো আছেই!
প্রায় কয়েকদিন কেটে গেল।রিজভী সাহেব প্রায় সুস্থ হয়ে উঠেছেন।এদিকে পদ্মের মেডিকেলে এক্সাম হয়ে গেছে তাই রেজাল্ট আউট না হওয়া পর্যন্ত ঘরে বসেই দিন কাটছে, এ ফাকে পদ্ম কিছু কাজ শিখে নিচ্ছিল।কয়েকদিন বাবার অফিসে গেছিল দেখতে যে বাবা না গেলে অফিস পাড়ায় কি চলে। কিছুদিন এভাবে কেটে গেছিল। অফিস যাওয়া আর বাবাকে দেখাশোনা করা।
একদিন সকালে রিজভী সাহেব স্যুট বুট পরে তৈরি হচ্ছেন অফিসের দিকে যাবেন বলে। এমন সময় রেনু আপা এল দরজার পাশে।
-কিরে কিছু বলবি?
-হ্যা খালু,বাইরের ঘরে কয়েকজন ছেলে এসেছে আপনার সাথে দেখা করতে।
ভ্রু কুচালেন রিজভী সাহেব..
-কয়েকজন ছেলে মানে? এখানে কি কাজ তাও এত সকালে?
-আমিতো জানিনা,তাদের দেখে মনে হলো অফিসের কেউ।তাই আপনাকে বলতে এলাম।আমি তাদের বসতেও বলেছি।
- আচ্ছা ঠিক আছে তুই যা।আমি দেখছি।
রিজভী সাহেব তৈরি হয়ে বের হলেন,একটু পদ্মের রুমের দিকে উকি মারলেন।দরজা খোলা আছে।তাহলে পদ্ম উঠে গেছে কিন্তু এত সকালে তো উঠেনা! রিজভী সাহেব এবার ভাবছেন,পদ্ম অফিসে কিছু করে আসেনি তো!
যাক,তিনি এসব ভাবতে ভাবতে বাইরের ঘরটার দিকে গেলেন। রেনু কে একটু আওয়াজ দিয়ে গেলেন সকালের নাস্তাটা টেবিলে রাখতে।
আসলে ব্যাপারটা হচ্ছে, পদ্ম কয়েকদিন অফিসে গেছিল আর তখন দেখল প্রায় সব জায়গায় বাবার নজরদারি করতে হয়।অফিসে একজন শক্তপোক্ত ম্যানেজার দরকার।পদ্ম বুঝতে পেরেছিল এত বেশি কাজ করা বাবার উপর বেশি চাপ হয়ে যায়। তাই পদ্ম নিজ দায়িত্বে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল যে তার অফিসে একজন ম্যানেজার দরকার।তবে ইন্টারভিউ দিতে হলে যেন তারা বাড়ির ঠিকানায় আসে।
কারণ পদ্ম চেয়েছে সে এবং তার বাবা বাড়িতে বসেই ক্যান্ডিডেট চুজ করবে।একটা ভুল হয়েছে বাবাকে সে বলে রাখেনি।
রিজভী সাহেব কে দেখে ছেলেগুলো দাঁড়িয়ে সালাম জানাল।৫ জন মত এসেছে ইন্টারভিউ দিতে।রিজভী সাহেব তাদেরকে বসতে বললেন।আরো কিছু বলতে যাবেন এমন সময় দেখল পদ্ম ঢুকছে রেনুকে নিয়ে।রেনুর হাতে বড় একটি ট্রে।আর চা নাস্তা এই যা হয় নিয়ে আসল। রিজভী সাহেব যেন একটু অবাক হলেন। আরো অবাক হলেন যখন দেখলেন পদ্ম একদম তৈরি হয়ে হাতে কি সব ফাইল টাইল নিয়ে বসল।
-আমি কিছু বুঝতে পারছিনা পদ্ম..whats happening here?
-Baba, firstly im sorry I just forgot to tell you about this incident..আমি বলছি সব,তুমি প্লিজ দেখ শুধু....
- ঠিক আছে।
পদ্ম সম্পুর্ন ব্যাপারটা বাবাকে বুঝিয়ে বলল।কিন্তু রিজভী সাহেব বললেন,
- আমি অফিস না গেলে আমার সময়টা যে বেকার হয়ে যায় মামনি?
-বাবা,তোমাকে বেকার থাকতে দিব না।তোমার জন্য একটা অফিস রুম হবে বাসায়।
-মানেটা কি? খুলেই বল তো..
-তুমি আমাকে বলতে দিলে ত? শোন বাবা, তোমার এত বেশি স্ট্রেস নেয়ার দরকার নেই।আমি যে কদিন অফিসে গেলাম আর তাতে বুঝলাম তোমার একজন এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার দরকার। আর তাই আমি বিজ্ঞাপন দিয়েছি। গতরাতে অফিস থেকে আমার মোবাইলে ক্যান্ডিডেটদের একটা প্রোফাইল পাঠানো হয়েছে।এখানে যে ৫ জন দেখতে পাচ্ছ তারা আজকে ইন্টারভিউ দিতেই এসেছে। আর সকালেই যেহেতু তারা এসেছেন তাই তাদের কে কিছু স্ন্যাকস দেয়া হয়েছে।এবার তুমি চল নাস্তা করে নিবে,তোমার মেডিসিন আছে।
- এখন আমি তাদের বসিয়ে রেখে খেতে যাব? আর তুই এত কিছু করলি আমাকে একটু জানাবিনা? ম্যানেজার দিয়ে আমি কি করব? আমিতো সব সামলাচ্ছিলাম.....
-প্লিজ বাবা,কোন কথা নয়।তুমি চল খেয়ে নেবে।
আর হ্যা,আপ্নারা স্ন্যাকস টা নিয়ে নিন।বাবার মেডিসিন আছে৷ আপনারা যদি কিছু মনে না করেন তাহলে.......
তখন একজন ক্যান্ডিডেট নাম আয়ান হাবিব বলে উঠলেন
-আমাদের কোন প্রবলেম নেই। please you carry on..
খেতে বসে বাবা মেয়ে কিছুক্ষন এ ব্যাপারে কথা বলে নিল।
রিজভী সাহেব তার মেয়ে কে বারবার বলতে চান এসবের কোন দরকার নেই।আর মেয়ে বাবাকে বলে দরকার আছে।
এবার রেনু আপা কথা বলে উঠল..
-খালু আপনার কিন্তু রেস্টের দরকার আছে।তাছাড়া পদ্মের বুঝার বয়স হয়েছে,না বুঝেত কিছু করছেনা।তুমি বাড়িতে থেকে অফিস করবে এর চেয়ে ভাল আর কি হয়....
-হ্যা তুমি বাকি আছ আর কিছু বলার...দেখা যাক মেয়ে আমার কি ভাল করতে চায়।
বাইরের ঘরে এসে রিজভী সাহেব সবার প্রোফাইল গুলো দেখে নিল।পদ্ম বাবাকে সবটা বুঝিয়ে দিচ্ছিল।তার মধ্যে দুজন ক্যান্ডিডেট রিফিউজ হয়েছেন তাদের গ্রাজুয়েশন করা নেই। বাকি রইল ৩ জন।তাদের মধ্যেও আরো একজন রিফিউজ হলো অপ্রাসঙ্গিক কথা বার্তার জন্য।বাকি দুজনের প্রোফাইল ভাল ছিল তবে সেখানে একজনের গ্রাজুয়েশন রানিং ছিল তাই তাকে ম্যানেজার এর পিএ পদটা দেয়া হলো।ছেলেটার নাম মিরাজ রাইয়ান। বিবিএ থার্ড ইয়ারে পড়ছে।আসলে ছেলেটার ফ্যামিলিতে কন্ট্রিবিউট করার জন্য তার এই জব টা দরকার।তাই তাকে পদ্ম নিরাশ করেনি।পদ্ম ভাবল পরে অন্য কোন পজিশন দিয়ে দিবে।আগে অফিস টা গোছানো দরকার।
যাইহোক,এবার বাকি একজন কে দেখার পালা।ইনি হলেন আয়ান হাবিব।এমবিএ করেছেন।নতুন জব করবেন তাই রিজভী সাহেব একটু ভাবছিলেন৷পদ্ম উনাকে ডেকেছে।আয়ান সাহেব কে সামনে বসিয়ে সে কয়েকটি কথা বলে নিল।শেষে বলল
-আয়ান সাহেব আপনার প্রোফাইল দেখে আমার মনে হচ্ছে আপনাকে আমি চুজ করতে পারি!
-its my pleasure mem...
-পদ্ম হেসে উঠল.. পদ্মের বাবা যেন হকচকিয়ে গেলেন মেয়ের হাসি দেখে! তেমনি আয়ান সাহেব যেন অবাক হলেন আর ভাবছেন এত সাচ্ছন্দ্য নিয়ে কেউ যে হাসতে পারে? ভারী সুন্দর হাসি...
পদ্ম বলল- বাবা সরি হেসে দিলাম৷আসলে উনি আমাকে মেম বলেছেন তো!যাইহোক,বাবা আজকের মত সিলেকশন শেষ।আমি এবার বের হব।আমার মেডিকেলের রেজাল্ট আউট হবে আজ।তোমার কাজগুলো আয়ান সাহেব কে বুঝিয়ে দাও।তোমার অফিস টা আরেকটু গোছাতে হবে।
-তুই আমাকে ধরে বেধে যখন এত করালি বাকিটা আর কি থাকবে আমি বুঝিয়ে দেব।তবে একদিক থেকে ভালই হলো, আমার একজন ম্যানেজার দরকার আমি এটা বুঝতে দেরি করেছি।
এরপর প্রায় কয়েকদিন কেটে গেল। মেডিকেলে চান্স পেয়েছে পদ্ম।তাই তাকে রেগুলার ক্লাস করতে হচ্ছে। রিজভী সাহেব নিয়মিত অফিস করছেন বাসায় থেকে। আয়ান নামের ছেলেটি আসলে খুব ভাল। অফিসের দায়িত্বটা বুঝে নিয়ে সবটা সামলাচ্ছে রিজভী সাহেবের কোন মাথাব্যথা নেই বললেই চলে।
একদিন সকালে বাসায় মামা মামি এলেন।পদ্ম বাসায় নেই।রেনু চা নাস্তা দিয়ে গেল।রিজভী সাহেব অফিস ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন দেখা করতে।সাথে আয়ান ও ছিল।কিছু পেপার দেখানোর ছিল তাই আসা।পদ্মের মামা মামির সাথে আলাপ হলো আয়ানের।
আয়ান তার বাবা মাকে খুব ছোটবেলায় হারিয়েছে।যখন তার বয়স ছিল মাত্র ৮ বছর।এরপর থেকে তার ছোট খালা তাকে বড় করেছেন।আয়ান খালার সাথে থাকত।কিন্তু খালার সাথেও বেশিদিন থাকা হয়নি।খালার বিয়ে ঠিক হয়।খালার বিয়ের সময় আয়ান এর বয়স ছিল ১৮ বছর।ইন্টারমিডিয়েট দিয়েছে। কয়েকদিন খালার সাথেও ছিল। কিন্তু খালার বাড়িতে থেকে যা ভোগান্তি তা বুঝার মত বয়স আয়ানের হয়েছিল। তাই সে খালাকে রিকুয়েষ্ট করে হোস্টেলে চলে গেছিল। সেখান থেকে আস্তে আস্তে টিউশন করে নিজের খরচ চালাত। তারপর ভার্সিটিতে পড়াকালে একটা পার্টটাইম জব নিয়ে সে পড়াশোনাটা চালিয়ে যায়।নিজের কষ্টে অর্জিত টাকা দিয়েই সে আজ এখানে পৌঁছাতে পেরেছে। বাবা মা তাকে ছেড়ে শুধু চলে যাননি তাদের পৈত্রিক সম্পত্তিও অন্যের ভোগ দখলে চলে যায় কারণ আয়ান ছোট ছিল।আর সে খালার সাথে চলে যায় বলে। তাই আয়ানের আর কোন পিছুটান নেই। সদ্য এমবিএ টা করে সে আর সময় নষ্ট করতে চায়নি।পদ্মের দেয়া বিজ্ঞাপন টা দেখেই চলে এসেছিল ইন্টারভিউতে।
যাইহোক,আয়ানের সাথে কথা বলে মামা মামির খুব ভাল লাগল।আয়ান ততক্ষণে অফিসে চলে গেল।পদ্মের মামা রিজভী সাহেব কে একটু ইশারা দিলেন।রিজভী সাহেব বুঝতে পারেন নি। এবার পদ্মের মামি বলেন
- ভাইজান আপনার এখন এসব বুঝা উচিত মেয়েটা বড় হচ্ছে।
- ভাবি আপনি ঠিক কি বুঝাতে চাচ্ছেন?
-না বুঝার ত কিছু নেই। পদ্ম বড় হচ্ছে। ওর একটা বিয়ে দিতে হবে যে....
- কি বলছেন এসব? বিয়ে দিব? আমি কি নিয়ে থাকব? আমার মেয়ে কে ছাড়া ত আমার পৃথিবীটাই অন্ধকার হয়ে যাবে।
- এসব বাজে কথার কোন মানে হয়না। মেয়ে হয়ে জন্মেছে যখন বিয়েটা একদিন দিতে হবে।
-কিন্ত আমি এমন একটা ছেলে কোথায় পাব যে আমার রাজকুমারীটাকে আদর যত্নে নিজের কাছে আগলে রাখবে আর আমার চেয়েও বেশি ভালবাসবে?
এবার মামা বললেন
-রিজভী তুমি আগে আয়ান কে একটু লক্ষ্য করো আর পদ্মের দিকেও খেয়াল রেখো।তোমার রাজকুমারি জন্য রাজকুমার তৈরি আছে।
-কিন্তু পদ্ম এটা মেনে নেবে? সবেমাত্র মেডিকেল স্টার্ট হয়েছে।আর আয়ান ছেলেটাকে আমি কতই বা চিনি বলো তো?
মামি বললেন
-ভাইজান আমি অনেকবার যাতায়াতের সময় দেখেছি পদ্ম আর আয়ান ছেলেটাকে একসাথে হেটে আসতে।তাই দেখেই ত আমরা আজ এখানে এলাম।আসলে আয়ান কে দেখে আমাদের পছন্দ হয়েছে।বাকিটা ত আমরা জেনে নিলাম এর মধ্যে কোথাও ত ফাক পেলাম না।আপনি একটু ভেবে দেখুন।
- কিন্তু পদ্ম আমাকে ছেড়ে যেতে চাইবে কি?
-আপনি একবার পদ্মের সাথে কথা বলেই দেখুন না। বাকিটা না হয় পরে দেখা যাবে।
-নাহ।এখন নয়।মেয়েটা অনেক আশা নিয়ে ডাক্তারি পড়ছে।আমি আরো একটু অপেক্ষা করতে চায়।
-কিন্তু....
-প্লিজ ভাইয়া ভাবি। আমাকে আর এ ব্যাপারে এখন কিছু বলবেন না। সময় হলে আমি কথা বলব পদ্মের সাথে।
আর কথা এগুই নি।মামা মামি চলে গেলেন।
রিজভী সাহেবের মনে একটা ধাক্কা খেল।এসব কি শুনছেন তিনি!কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে আর কথা বড়াতে চান নি।
দেখতে দেখতে কেটে গেল দুই বছর৷ পদ্ম থার্ড ইয়ারের ক্লাস করছে। আর আয়ান বিশ্বস্ততার সাথে এক নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছে।
রিজভী সাহেবের বয়স বাড়ছেন। দেখতে দেখতে তার বার্ধক্যগুলোও ধরা দিচ্ছে একে একে। রিজভী নিজেকে বুঝাতে চাইলেন- আর কত দিন এভাবে চলে? এবার তো পদ্মের সাথে কথা বলতেই হবে।
দুপুরে পদ্ম বাসায় এসে চেঞ্জ করে নিল।খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হলে পদ্ম নিজের ঘরে যায় একটু রেস্ট নিবে বলে।এমন সময় পেছন থেকে বাবা ডাকলেন।
- মামনি একটু শুনবি..
- হ্যা বাবা বলো
-একটু আমার ঘরে আয় নারে।দুটা কথা বলি
-কি হয়েছে বাবা তোমার? এমন ভাবে কথা বলছ?আমি আসছি.. এস..তো...
বাবার ঘরে এসে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল বাবা মেয়ে।বাবা কিছু বলতে যাবে এমন সময় পদ্ম ফুপিয়ে কেঁদে উঠল।বাবা একটু অবাক হল বটে কিন্তু তেমন বেশি অবাক হয়েছে বলেও মনে হচ্ছেনা।
-এভাবে কাঁদছিস কেনরে? আমিতো সব বুঝি নাকি? তুই যে আমার আঁধারমানিক। আমি না বুঝলে কে বুঝবে বল?
-বাবা আমি অন্যায় করেছি তুমি আমাকে শাস্তি দাও।তোমাকে এভাবে ইগনর করাটা আমার উচিত হয়নি...
-কে বলেছে তুই ইগনর করেছিস? আমি কি একবার ও বলেছি এ কথা? তাছাড়া তুই অন্যায় যে করেছিস তা কিন্তু মিথ্যে নয়।আর এ জন্যে আমি একটা শাস্তির ব্যাবস্থা করেছি।
-বাবা...!
- হুম,আমি আজকে বিকালে আয়ান কে একবার আসতে বলেছি আর তোর মামা মামিকেও আসতে বলেছি।আমাদের আর কেউ তো নেই। তারাই আসুক।
-তুমিও না বাবা....প্রায় লজ্জা পেয়ে পদ্ম তার ঘরে ছুটে গেল।
পেছন থেকে বাবার অট্ট হাসির আওয়াজ টা পেল পদ্ম।
আসলে ব্যাপারটা যে এভাবে বাবার সামনে চলে আসবে তা পদ্ম কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি।
আয়ান ই প্রথম পদ্ম কে প্রপোজ করে। পদ্ম প্রথমে বুঝতে পারেনি।শুধু বলেছিল বাবার মন মত হলে তবে সে এগুতে পারে।আয়ান ও জোর করেনি। সময় নিয়েছে।তাছাড়া সে চায়নি পদ্মের পড়াশোনায় কখনো কোন সমস্যা হোক।আয়ান কে যেহেতু প্রতিদিন স্যারের বাসায় আসতে হতো তাই আল্টিমেটলি পদ্মের সাথে দেখা হতো। হায়,হ্যালোর মধ্যে কথা বার্তা সীমাবদ্ধ থাকত।পদ্মের প্রতি আয়ানের প্রথম দিন থেকেই একটা আলাদা আকর্ষণ হয়েছিল। কিন্তু সে সুন্দর মূহুর্ত গুলো নষ্ট হতে দেয়নি। পদ্মকে নজরে রেখেছিল।তারপর একদিন সময় সুযোগ করে পদ্মকে প্রপোজ করে।খুব ভাল লেগেছিল পদ্মের কথা গুলো। যথেষ্ট বুদ্ধিমতি পদ্ম।তবে তাদের ভাব ভালোবাসা হতে আর বেশি সময় লাগেনি।আয়ানের ব্যাবহার,আচার আচরণ আর সুন্দর বলিষ্ঠ চেহারা,সুঠাম দেহের কাঠামো দেখে পদ্ম সত্যি মুগ্ধ ছিল! তাছাড়া কথা বলে অনেক সময় দেখা যেত দুজনের কথায় অনেক মিল।এই দুবছরে তাদের মাঝে ভালোলাগা ভালোবাসা যেন আরো বেড়ে গেল। তবে তারা সবসময় সীমিতভাবে দেখাশোনা করত আর কথা বলত।কবে কিভাবে এ ব্যাপারটা বাবা বুঝতে পারল কে জানে!
পদ্মের কাছে ব্যাপারটা অন্যায় মনে হতেই পারে।সে কখনো বাবার কাছে কিছুই লুকোয় নি।এ ব্যাপারটা চেপে গেছে অনেকটা লজ্জায় আর ভয়ে। তবে বাবা সবটা মেনে নেয়াতে পদ্মের আনন্দ যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেল।
বিকেলে সবাই এল।আয়ান কে আর আলাদা করে কিছু বলেনি পদ্ম।চেয়েছিল সে যেন সারপ্রাইজড হয়!
হলো ও তাই। আয়ান এই বাড়ি এসে দেখে চারিদিকে কেমন সাজ সাজ রব।দুয়েকজন গেস্ট ও এসেছে।আবার অফিসের কয়েকজন কলিগ কেও দেখা গেল।তারা আবার মুচকি মুচকি হাসছে আয়ান কে দেখে। আয়ানের কেমন যেন খটকা লাগছে! স্যার কেন ডাকল তাকে। তাও অফিস আওয়ার নয় এখন....
-এই যে মিস্টার কেমন লাগছে দেখুন তো? পদ্মের আওয়াজে শোনা গেল.....
-পদ্ম আমি ঝলসে যাচ্ছি যে! এটা কেন?
- ঝলমলিয়ে হেসে উঠল পদ্ম আর বলে সারপ্রাইজ..সারপ্রাইজ...
পদ্ম প্রায় দৌড়ে চলে গেল ভেতরে।
আয়ান টা কেমন অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আবার মনের কোণে কোথায় যেন এক ঝলক আনন্দ তকমক করছিল কিন্তু সেটা প্রকাশ পাচ্ছেনা।
আস্তে হাটতে হাটতে আয়ান ভেতরে গেল।
-ওমা! একি খালা এখানে তুমি?
-কিরে বিয়ে তা করবি আর আমায় জানালি না?
- কার বিয়ে? কিসের বিয়ে? কি বলছ এগুলো?
- থাক থাক, আর নাছোড়বান্দা হয়ে কাজ নেই।সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা কর।। এস।
আয়ানের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল খালা।
ভেতরের ঘরে ঢুকে আর চমকের শেষ নেই।
আজকেই এনগেজমেন্ট টা হয়ে গেল পদ্মনীল আর আয়ান হাবিবের।
তাদের চার হাত এক হলো আজ। একটি পরিপূর্ণ পবিত্র ভালবাসা আজ নতুন বন্ধনে আবদ্ধ হলো।
রিজভী সাহেব যেন দায়মুক্ত হলেন।নিজেকে অনেক হালকা বোধ করছেন।এতদিন মেয়ে টা ভেতরে ভেতরে গোমরাচ্ছিল।আজ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল যেন।
দুটি মন আজ মিলেমিশে একাকার।
জীবনের যত দুর্ভাগা গল্প,অপ্রিয় ঘটনা আর না ছুঁয়ে থাকে এই কচি মনের গহীন অরণ্যে। বেচেঁঁ থাকুক শুধু তাদের অটুট ভালবাসা। এগিয়ে যাক তাদের জীবন এক নতুন ধারায়....
........ ... টু বি কন্টিনিউড .. ......
প্রত্যেক মানুষের জীবনে এমন অপ্রিতিকর ঘটনা ঘটে থাকে।তবু তাদেরকে সামনের পথে এগিয়ে যেতে হয়।নতুন কোন সুখের সন্ধানে খুঁজে বেড়াতে হয় আপন মনে।এক চিলতে সুখের আশায় মানুষ দিনাতিপাত করে। জীবন কখনো থেকে থাকেনা। তাই দুঃখের সময় সেই বাস্তবতা মেনে নিয়ে পথচলা কঠিন হলেও একসময় সুখের দেখা মিলবে। মানুষের কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে রাতের অন্ধকার বেশিক্ষন স্থায়ী থাকেনা। ভোর হবে সূর্যের একরাশ আলো নিয়ে।আবার নতুন দিনের সূচনা হবেই....
😍😍😍😍😍😍😍👍👍👍👍💖💕💗💓❤️💝💞💟❣️ very nice...
উত্তরমুছুন